বৃহস্পতিবার ২৩ জুলাই ২০২৬ - ১৭:১৫
হিংসার রাজনীতি ও শান্তির প্রত্যাশা: ভারতের দ্বন্দ্বময় চিত্র

ভারতবর্ষের সংবিধান যে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, আজ সেই স্বপ্ন যেন ধুলিস্মাৎ হওয়ার পথে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেন এক অশান্ত সমুদ্র, যেখানে হিংসার ঢেউ তীরে তীরে আছড়ে পড়ে। ধর্মের নামে রাজনীতি আজ প্রাধান্য পাচ্ছে, নেতারা বিভাজনের অস্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছেন, আর সাধারণ মানুষ-যারা শান্তি, শিক্ষা ও নিরপেক্ষ শাসন চায়-তারা যেন চরম বিপর্যস্ততার মধ্যে দাঁড়িয়ে। এই প্রবন্ধে আমরা দেখব কীভাবে রাজনীতির এই ঘৃণার রাজত্ব দেশের সামাজিক বুননকে ছিন্নভিন্ন করছে এবং জনতার নীরব আর্তনাদ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,

হিংসার উৎস ও রাজনৈতিক কারসাজি:

বর্তমান রাজনীতির মূল উপজীব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ভোটব্যাঙ্কের’ হিসাব। নানা রাজনৈতিক দল ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে সমাজকে খণ্ডিত করছে। মঞ্চে বলেন উন্নয়ন, কিন্তু আড়ালে চালান বিভেদের অগ্নিসংযোগ। সামাজিক মাধ্যমে যেমন ভুয়া খবর ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তেমনই জনসভায় ভাষণে এমন শব্দবাণ ব্যবহার করা হয়, যা এক সম্প্রদায়ের মনে অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ জন্মায়। রাজনীতি আজ আর জনসেবার মাধ্যম নয়; এটি পরিণত হয়েছে ক্ষমতা দখলের এক নির্মম খেলায়, যেখানে ধর্মকে রাজনীতির পুঁজি করা হচ্ছে। যে নেতারা জাতির পিতার অহিংসার পথ দেখিয়েছেন, তাঁদের কথাও আজ বাস্তবে উপেক্ষিত।

জনতার আকাঙ্ক্ষা ও সরকারের দিকনির্দেশনার ফারাক:

প্রান্তিক মানুষটি ঠিক কী চায়? সে চায় সন্তানের মুখে বিদ্যালয়ের আলো, চায় পেটের দাবি মেটানোর রুটি, চায় চিকিৎসার জন্য একটি হাসপাতাল, আর চায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান-যেখানে ধর্মের পরিচয়ে বিচার না হয়, কাজের যোগ্যতায় বিচার হয়। সাধারণ মানুষ অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে শিক্ষার আলো দেখতে চায়। তারা ধর্মের রাজনীতি চায় না; তারা চায় নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী সরকার, যা সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করবে।

কিন্তু সরকার ও ক্ষমতাসীন নেতৃত্বের অগ্রাধিকার যেন অন্য খাতে। তাদের কাছে মনে হয় জনতার এই শান্তির প্রার্থনা কোনো কাজের নয়; বরং হিংসার রাজনীতিই তাদের ক্ষমতার আসন মজবুত করে। যখন বিচার ব্যবস্থা দুর্বল হয়, পুলিশ রাজনৈতিক নির্দেশে চলে, তখন শান্তির পথপ্রার্থী মানুষ অসহায় হয়ে পড়ে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে বাধা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, গো-রক্ষার নামে নির্যাতন-এসবের মধ্য দিয়ে নেতারা প্রমাণ করতে চান তাঁরা ‘তাদের’ সম্প্রদায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, যদিও দেশের সংবিধান সকল নাগরিককে সমান অধিকার দেয়।

হিংসার ফলাফল ও দেশের ভবিষ্যৎ:

হিংসা কেবল প্রাণহানি ঘটায় না; এটি অর্থনীতি, শিক্ষা ও সামাজিক সম্পর্ককে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যখন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দেখে যে এখানে অশান্তি লেগেই থাকে, তারা পিছিয়ে যায়। যখন শিক্ষার্থীরা কলেজে গিয়ে দেখে সাহিত্য ও বিজ্ঞানের বদলে রাজনৈতিক দাঙ্গা চলছে, তখন তাদের মন মানসিকতা বিকৃত হয়। যে দেশে মানুষ ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে যায়, সেখানে জাতীয় ঐক্য কখনোই শক্তিশালী হয় না। ইতিহাস সাক্ষী, ধর্মীয় গোঁড়ামি কখনো উন্নয়ন ডেকে আনে না; বরং এটি সভ্যতাকে পিছনের দিকে ঠেলে দেয়।

শেষ কথা:

আমাদের মনে রাখতে হবে, ভারতের শক্তি তার বৈচিত্র্যে। এখানে সকল ধর্মের মানুষ হাজার বছর ধরে বসবাস করে আসছে। এই দেশের তরুণ প্রজন্ম আজ এই বিভেদমূলক রাজনীতির বিরুদ্ধে কথা বলছে। তারা জানে, সত্যিকারের স্বাধীনতা অর্থ ক্ষুধা-অজ্ঞতা-হিংসা থেকে মুক্তি। রাজনীতিবিদরা যদি এই আহ্বান না শোনেন, তাহলে আগামী দিনে ইতিহাস তাঁদের কঠোর বিচার করবে। জনতার সেই নীরব আর্তনাদ-‘আমরা শান্তি চাই, শিক্ষা চাই, নিরপেক্ষতা চাই’-একদিন না একদিন রাজপথ থেকে সংসদ পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হবে। ভয় নয়, ভালোবাসা; ঘৃণা নয়, সহমর্মিতা; অজ্ঞতা নয়, জ্ঞান-এটাই হোক আমাদের আগামী দিনের পথপ্রদর্শক। তার পরেই আসবে প্রকৃত বিকাশ, যা সব ভারতীয়ের অধিকার।

হাসান রেজা

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha